Mirsarai





আসলাম-হাসান দ্বন্ধ : এক মাসে মিরসরাই বিএনপির তিন কমিটি!

চট্টগ্রাম উত্তরজেলা বিএনপির আহবায়ক আসলাম চৌধুরী ও সদস্যসচিব কাজী আব্দুল্লাহ্ আল হাসানের মধ্যে সৃষ্ট কোন্দল দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায়। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে গত ২৬ এপ্রিল গঠিত আহবায়ক কমিটির গুরুত্বপূর্ণ এই দুই নেতা দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে চরম কোন্দল আর দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা গত এক মাসের মধ্যে একে একে মিরসরাই উপজেলা বিএনপির তিনটি কমিটি ঘোষণা করেছেন। এতে এখানকার স্থানীয় বিএনপির রাজনীতি আবারো দাবিত হতে চলেছে অনিশ্চিত গন্তব্যে। অপর দিকে জেলার এই দুই নেতা একে অপরের প্রতি নেতিবাচক মন্তব্যও করে চলেছেন হরহামেশা। চট্টগ্রাম উত্তরজেলা বিএনপির আহবায়ক আসলাম চৌধুরী  বুধবার বলেন, ‘দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটির নির্বাচনের ক্ষেত্রে আহবায়ক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।’ অপরদিকে জেলা সদস্যসচিব কাজী আব্দুল্লাহ্ আল হাসান বলেন, ‘কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিবের দেওয়া একটি চিঠিতে বলা আছে, আহবায়ক ও সদস্যসচিব ¯^াক্ষরিত কমিটি গ্রহণযোগ্য হবে।’ মাত্র তিন দিনের মাথায় জেলা সদস্যসচিব ঘোষিত মিরসরাই উপজেলা বিএনপির দুইটি কমিটি প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমার সদস্যসচিবের রাজনৈতিক কর্মকান্ড দেখে তিনি সুস্থ আছেন কি না তা নিয়ে আমি সন্দিহান। না হয় নিজের ঘোষিত কমিটি নিজেই কেন বাদ দিবেন?’ অপরদিকে কাজী হাসান জেলা আহবায়কের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে  বলেন, ‘তিনি (আসলাম চৌধুরী) বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছেন সম্প্রতি। পূর্বে তিনি করতেন জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি। সবসময় তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তাই তাঁর মাথা ঠিক নেই। আমি পরীক্ষিত নেতাদের নিয়ে কমিটি দিয়েছি।’ এদিকে স্থানীয় বিএনপির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা  জানিয়েছেন, জেলা আহবায়ক ও সদস্যসচিবের ব্যক্তিগত দ্বন্ধে আবারো মিরসরাই বিএনপি একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এসময় ওই নেতারা জেলার শীর্ষ দুই নেতার চলমান দ্বন্ধ মেটাতে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপ কামনা করেন। জানা গেছে, গত জুলাই মাস থেকে আহবায়ক আসলাম চৌধুরী ও সদস্যসচিব কাজী আব্দুল্লাহ্ আল হাসান আলাদাভাবে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভায় ঘোষণা করছেন নিজেদের মনগড়া কমিটি। গত ২৭ জুলাই আসলাম চৌধুরী জেলার সাবেক যুগ্ম সম্পাদক নুরুল আমিনকে আহবায়ক করে ঘোষণা করেন ৫১ সদস্যের মিরসরাই উপজেলা বিএনপির কমিটি। ইতমধ্যে ওই কমিটি উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন বিএনপির কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও হাতে নিয়েছে। এর ২৬ দিনের মাথায় গত ২৩ আগষ্ট কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য প্রফেসর এমডিএম কামাল উদ্দিন চৌধুরীকে আহবায়ক করে কাজী হাসান ঘোষণা করেন একটি পাল্টা কমিটি।  প্রথম দিকে ঘোষিত কমিটি নিয়ে স্থানীয় বিএনপিতে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও সদস্যসচিব ঘোষিত পাল্টা কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্বয়ং এই কমিটির আহবায়ক কামাল উদ্দিন চৌধুরী নিজে। এছাড়া ওইদিন হাসানের পাল্টা কমিটিতে থাকা অধিকাংশ বিএনপি নেতা তাদের মতামত না নিয়ে পাল্টা কমিটিতে তাদের নাম অন্তর্ভূক্ত করায় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। নেতাদের প্রতিক্রিয়ার পর গত মঙ্গলবার (২৭ আগষ্ট) জেলা সদস্যসচিক কাজী হাসান নিজের করা পূর্বের কমিটি বিলুপ্ত করে মিরসরাই বিএনপির নতুন আরেকটি আহবায়ক কমিটি (সংশোধিত) ঘোষণা করেছেন। ৬২ সদস্যের এই কমিটির আহবায়ক করা হয়েছে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম আলাউদ্দিনকে। বুধবার এম আলাউদ্দিন  জানিয়েছেন, ‘এসব বিষয়ে এ মুহুর্তে কোন মন্তব্য নেই, সময় হলে সংবাদ সম্মেলন করে পুরো বিষয়টি পরিস্কার করা হবে।’ ওই কমিটির যুগ্ম আহবায়ক গাজী নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘আমি নিজে দেখিনি তবে লোকের মুখে শুনেছি বুধবার জেলা সদস্যসচিব ঘোষিত কমিটিতে আমাকে যুগ্ম আহবায়ক করা হয়েছে। কেন করেছে তা আমি জানি না। এ বিষয়ে আমার থেকে কোন মতামত নেওয়া হয়নি। আমি গত ২৭ জুলাই আহবায়ক ঘোষিত কমিটির যুগ্ম আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।’ তবে ওই কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মিরসরাই উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাঈন উদ্দিন মাহমুদ জানান, ‘আমি নিজেই জেলা সদস্যসচিবকে দিয়ে ওই কমিটি গঠন করিয়েছি।’ জেলা আহবায়ক আসলাম চৌধুরী ঘোষিত কমিটির যুগ্ম  আহবায়ক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী, এম আলমগীর ও আজিজুর রহমান জানান, ‘মিরসরাই বিএনপির রাজনীতিকে ধ্বংসের জন্য এটি একটি হটকারীতা ছাড়া কিছু নয়। হাসান সাহেব নিজের ইচ্ছায় একের পর এক কমিটি দিয়ে চলেছেন। আহবায়ক আসলাম চৌধুরী যে কমিটি ঘোষণা করেছেন তা বৈধ কমিটি। ওই কমিটি ইতমধ্যে দলের ইউনিয়ন পর্যায়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ আসলাম চৌধুরী ঘোষিত কমিটির আহবায়ক উত্তরজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নুরুল আমিন জানান, ‘একসময় মিরসরাই বিএনপি একাধিক ভাগে ভিবক্ত হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ ২৭ মাস পর জেলা বিএনপির এখানকার বিএনপির দ্বিধাভিবক্ত নেতাদের একই ফ্যাটফর্মে আনতে সকলকে নিয়ে একটি আহবায়ক কমিটি দিয়েছে। বর্তমানে নেপথ্য থেকে একটি ষড়যন্ত্রকারী মহল বিএনপিকে আবার ভাঙতে ষড়যন্ত্র করছে। এটা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না।’ নুরুল আমিন বলেন, ‘আমরা ইতমধ্যে উপজেলার সকল ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। কে কোথায় কাকে দিয়ে কমিটি দিল তা আমাদের জানার দরকার নেই।’ প্রসঙ্গত, দলের কোন্দল ঠেকাতে ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি মিরসরাই উপজেলা ও দুই পৌরসভা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করে উত্তরজেলা বিএনপি। এরপর প্রায় ২৭ মাস ধরে এখানকার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ইউনিট ছিল কমিটিবিহীন। এ নিয়ে দলের ভেতরে বাড়তে থাকে দ্বিধা-দ্বন্ধ, বিরাজ করে নেতৃত্বের শূন্যতা, ভেঙ্গে পড়ে দলের চেইন অব কমান্ড। দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গত ২৬ এপ্রিল তাঁর গুলশান কার্যালয়ে জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসলাম চৌধুরীকে আহবায়ক ও সাবেক যুগ্ম সম্পাদক কাজী আব্দুল্লাহ আল হাসানকে সদস্যসচিব করে গঠিত জেলা বিএনপির কমিটিকে ৪৫ দিনের মধ্যে দলের কাউন্সিলের মাধ্যমে মিরসরাইয়ের তিনটি ইউনিটসহ চট্টগ্রাম উত্তরজেলার সকল ইউনিটের কমিটি করার নির্দেশ দেন। এরপর থেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এই দুই নেতা দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়েছে।
2014-08-29 10:14:47
source : http://mirsarainews.com/?p=47