Mirsarai





সাবিহা এখন শ্বশুর বাড়ি

বিষাদ আর বিচ্ছেদে ভরা একটি ভালোবাসার গল্প যেন মুহুর্তেই বদলে গেল। রূপ নিল সুখ-স্বপ্নে ভরা স্বার্থক এক জীবন গল্পের উৎসবে। আর এটি সম্ভব হয়েছে সমাজের কিছু ভালো মানুষের মানবিক সহমর্মিতা আর সহযোগিতায়। তারা একটি প্রেমিকযুগলকে জীবন বন্ধনে আবদ্ধ করিয়েছেন। আর ওই গল্পের প্রধান চরিত্রে ছিলেন সাবিহা রহমান নামের এক কলেজ ছাত্রী। যার পূর্বের নাম ছিল শশা রাণি নাথ। সে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পূর্ব কিসমত জাফরাবাদ গ্রামের একটি হিন্দু বনেদি পরিবারের মেয়ে। সাবিহা স্থানীয় ডিগ্রী কলেজের ব্যবসায় শিক্ষার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। গত কয়মাস আগে রণি নামের একটি যুবককে ভালোবেসে ছেড়েছেন স্বজন, সংসার আর নিজ ধর্ম। এত ত্যাগ স্বীকারের পরও কিছুদিন পূর্বে তাদের ভালোবাসার বন্ধনে বেজে ওঠে বিষাদ আর বিচ্ছেদের সুর। যুবক ছাড়তে চাইলেও ছাড়তে রাজি নয় সাবিহা। তাই স্থানীয় চেয়ারম্যান ও গণমান্য ব্যক্তিবর্গের কাছে প্রেমিকের বিরুদ্ধে নালিশ জানান। আর্তি জানান ভালোবাসার মানুষটিকে ফিরিয়ে দেওয়ার। অবশেষে তার ভালোবাসারই জয় হল। সকলের সম্মতিতে গতকাল গত ২১ আগষ্ট দুপুরে মিরসরাই উপজেলা অডিটোরিয়ামে বেশ ধুমধাম করে স্থানীয় বিশিষ্টজনদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল সাবিহা ও রণি প্রেমিক জুটির বিয়ে। ধর্ম ত্যাগের কারণে সাবিহার বিয়ে অনুষ্ঠানে বাবা-মা কিংবা স্বজন কেউই তাঁর পাশে ছিল না। তাতে কি হয়েছে ? গতকাল মহা ধূমধাম করে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠান। সাবিহার বাবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন মিরসরাই সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাফর উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী। তাঁর বর সীতাকুন্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের বগাছতর গ্রামের দিদারুল আলমের ছেলে সাদেকুর রহমান রণি। ব্যতিক্রমি এই বিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মিরসরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. গিয়াস উদ্দিন, মিরসরাই পৌরসভার সাবেক প্রশাসক আজহারুল হক নওশা মিয়া, মিরসরাই পৌর মেয়র এম শাহজাহান, মিরসরাই প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক শারফুদ্দীন কাশ্মীর, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ইয়াসমিন শাহীন কাকলি, ধূম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তারেক ইসমত জামশেদী, ওচমানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক, মঘাদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহীনুল কাদের চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এছাড়া বরের পরিবারের লোকজন ছাড়াও সীতাকুন্ড উপজেলার বিশিষ্টজনরাও উপস্থিত ছিলেন। ব্যতিক্রমি এই বিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজকরা জানিয়েছেন, ‘গত বুধবার বরের বাড়িতে গায়ে হলুদের ত্বত্ত পাঠানো হয়েছিল। পাঠানো হয়েছে নতুন সংসারের প্রয়োজনীয় ফার্নিচার।  কনের গ্রামে বুধবার সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠিত হয় গায়ে হলুদ। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা অডিটোরিয়ামে বিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে প্রীতিভোজ, শুভ আক্দ এবং মালাবদল অনুষ্ঠিত হয়।’ জানা গেছে, পাশের উপজেলা সীতাকুন্ডের একটি মুসলিম পরিবারের ছেলে সাদেকুর রহমান রণিকে ভালোবেসে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী শশা রাণি নাথ। ভালোবাসার স্বপ্নে বিভোর হয়ে দু’জনে পাড়ি জমিয়েছিলেন অজানা-অচেনা কোন প্রান্তরে। ভালোবাসার টানে ধর্ম ত্যাগ করে শশা।  এখন তাঁর নাম সাবিহা রহমান। গত মে মাসে ময়মনসিংহের একটি কাজী অফিসে মুসলিম ধর্মের রীতিনীতি মেনে রেজিষ্ট্রি করে বিয়েও করেছিলেন তারা। সে ভালোবাসা বেশিদিন টেকেনি। পরিবারের বাঁধার মুখে সাবিহার হাত ছেড়ে দেন রণি। গত জুলাই মাসে বাবা-মা, স্বজন আর সংসার-ধর্ম ত্যাগ করা সাবিহা নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে দাঁড়ান রাস্তায়। নিজের ভালোবাসার অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনুযোগ জানান স্থানীয় মিরসরাই সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর উদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরীর কাছে। হৃদয়বান চেয়ারম্যান মেয়েটিকে আশ্রয় দিয়ে রণির পরিবারের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। কিছুতেই ছেলের ভালোবাসাকে মানছিল না রণির বাবা দিদারুল আলম। পরে একে একে দুই উপজেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সাবিহার ভালোবাসার অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। শেষতক পুত্রবধূ হিসেবে সাবিহাকে মেনে নিতে রাজি হয় রণির বাবা ও পরিবারের লোকজন। তাই গতকাল বিরল এক ভালোবাসার নায়িকা সাবিহার বিয়ে হয় ধূমধাম আর হৈচৈ করে। চেয়ারম্যান জাফর উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘ছেলে মেয়ে দু’জনে ভালোবেসে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল। অভিভাবকদের টানাপড়েনে দুই মাসের মাথায় তাদের সংসার জীবনের ইতি ঘটে। মেয়েটি ধর্ম ত্যাগ করায় তার পরিবার মেনে নিচ্ছিল না বলে আমি তাঁর দায়িত্ব নিয়েছি। কয়েক দফা উদ্যোগের মাধ্যমে ছেলের পরিবারকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করিয়েছি। এখন আমি দায়িত্ব নিয়ে বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতার উদ্যোগ নিয়েছি।’ চেয়ারম্যান আরো জানান, ‘একটি মুসলিম পরিবারের বিয়ে অনুষ্ঠানে যা যা আয়োজন থাকে আমি এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের সহযোগীতায় সবরকম আয়োজন করেছি। যেন অবুঝ দুই ছেলে মেয়ের মনে কোন কষ্ট না থাকে।’ কনে সাবিহা ও বর রণি জানিয়েছেন, ‘আমাদের ভালোবাসার মাঝখানে এক টুকরো কালো মেঘ এসে জমা হয়েছিল। এখন আমরা পুনরায় একজন একজনকে পেয়েছি। এতে আমরা দুজনেই খুব খুশি। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’
2014-08-29 10:47:35
source : http://mirsarainews.com/?p=54