Mirsarai





স্বপনের খুঁটির জোর এমপি রহিম উল্ল্যাহ্

চলতি বছর ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্ধিতা করে ফেনী-৩ (সোনাগাজী) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন স্থানীয় রাজনীতির আনকোরা মুখ প্রবাসী হাজি রহিম উল্ল্যাহ্। চাচা এমপি হওয়ার সুবাদে এলাকায় দাপুটে হয়ে ওঠে ভাতিজা আবু ইউসুপ ওরফে স্বপন। চাচার জোরে সোনাগাজী উপজেলার সর্বত্র চলছে তার রাম রাজত্ব। চাঁদাবাজীর পাশাপাশি উপজেলার আমিরাবাদ ও সোনাগাজী সদর ইউনিয়নে চালাচ্ছেন দখল-বেদখল। বঙ্গপোসাগর উপকূলে জেগে ওঠা নতুন চরে দখল করেছেন শত একর জমি। মুহুরী প্রকল্পের গেইট এলাকায় ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গায় বানিয়েছেন পাকা দালানের সুপার মার্কেট। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত সংসদ নির্বাচনের পর সোনাগাজী উপজেলার ৭ নম্বর সদর ইউনিয়নের থাকখোয়াজের লামছি চরে শতাধিক একর খাস জমি দখল করে ¯^পন বানিয়েছেন মাছের ঘের। এসময় স্বপন পূর্বের দখলদারদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে দেন। যাদের অনেকেই এলাকার ভূমিহীন ও দুস্থ লোকজন। তারা অভিযোগ করেন, স্বপনের বিরুদ্ধে কোথাও কোন অভিযোগ দিয়ে লাভ হয় না। বরং যারা অভিযোগ দেয় তাদেরকে উল্টো শাস্তি পেতে হয়। নিজেদের নাম প্রকাশ না করা শর্তে সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের বেশ কয়েজন ভূমিহীন নারী-পুরুষ অভিযোগ করেছেন, হাজি রহিম উল্ল্যাহ্ এমপি হওয়ার পর তার ভাতিজা স্বপন ও তার লোকজন তাদের দখলীয় জায়গা থেকে পিটিয়ে উচ্ছেদ করে দেয়। এরপর স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কাছে নালিশ জানিয়েও কোন প্রতিকার মেলেনি। সূত্র জানিয়েছে, চরের জায়গা দখল-বেদখল প্রসঙ্গে ব্যবস্থা নিতে গত ২৭ জুলাই সোনাগাজী উপজেলা ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক আহবান করা হয়। সে বৈঠকে উপস্থিত হন এমপি রহিম উল্ল্যাহ্। যদিও বা ওই বৈঠকে এমপির উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি পূর্ব নির্ধারিত ছিল না। সেখানে নিজের ভাতিজার বিরুদ্ধে চরের জায়গা দখলের বিষয়টি আলোচিত হলে উপস্থিত সরকারি কর্মকর্তাদেরকে ধমক দেন এমপি। পরে বৈঠকটি অমিমাংশিত থেকে যায়। নিজের নাম ও পদবী প্রকাশ না করা শর্তে সোনাগাজী উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘কথায় কথায় এমপি মহোদয় আমাদেরকে হুমকি-ধমকি দেন। নিজের কোন আত্মীয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করলেও বকা খেতে হয়। তাই আমরা নিজেদের চাকুরি বাঁচাতে এসব বিষয় নিয়ে মুখ খুলি না। গত মাসের ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে তাঁর (এমপি) উপস্থিত থাকার কথা ছিল না। হঠাৎ তিনি বৈঠকে উপস্থিত হয়ে আমাদেরকে চরের জায়গা সংক্রান্ত কোন বিষয়ে মাথা ঘামাতে নিষেধ করেছেন।’ এ প্রসঙ্গে সোনাগাজী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য শামসুল আরেফিন জানান, ‘থাকখোয়াজের লামছি চরে ভূমিহীন লোকজনের জায়গা দখল করা হয়েছে বলে আমি জেনেছি। কারা করেছে তা আমার জানা নেই। আমার এলাকার কিছু লোকজন আমাকে বিষয়টি মৌখিকভাবে আমাকে জানিয়েছেন। তবে তাদেরকে আমি লিখিত অভিযোগ জানাতে পরামর্শ দিয়েছি।’ সোনাগাজী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সূবর্ণা সরকার জানান, ‘চরে জায়গা দখল হওয়ার বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে আমার কাছে কেউ কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেয়নি।’ নিজের ভাতিজার জায়গা দখলের বিষয়ে এমপি হাজি রহিম উল্ল্যাহ্র ধাম্ভিক উক্তি, ‘সরকার আমাদের, আমরা সরকারের। সরকারি জায়গা দখল করে মাছ চাষ করলে কোন ক্ষতি নেই।’ সরকারি জায়গা দখল করা কি অন্যায় নয়? জানাতে চাইলে এমপি বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রীদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছি। তাঁরা আমাকে জানিয়েছেন, নতুন জেগে ওঠা চরে মাছ চাষের মাধ্যমে অন্তত ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করতে। আমার ভাতিজা ওখানে মাছ চাষ করে উৎপাদন বাড়াচ্ছে। এতে সরকারও লাভবান হচ্ছে।’ এসময় তিনি এ প্রতিবেদকরে প্রতি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে বলেন, স্বপন আমার ভাতিজা বলে কথা উঠছে। এলাকায় হাজার হাজার একর জমি দখল করে মাছ চাষ হচ্ছে আপনারা তা লেখেন না কেন?।’ এদিকে সোনাগাজীর আমিরাবদা ইউনিয়নের মুহুরী প্রকল্প গেইট এলাকায় পাউবোর একটি জায়গা লীজ নেন এমপির ভাতিজা স্বপন। পাউবোর শর্তানুযায়ী সেখানে অস্থায়ী দোকানপাট নির্মাণের কথা রয়েছে। অথচ ওই জায়গায় স্বপন বানিয়েছেন সুপার মার্কেট। মার্কেটের নাম দিয়েছেন জিনিয়া সুপার মার্কেট। স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি নিজের নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানিয়েছেন, ‘পাউবোর জায়গায় স্বপন একতলা বিশিষ্ট একটি মার্কেট বানিয়েছেন। ওই মার্কেটে কয়েকটি দোকানও চালু হয়েছে। লীজ নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।’ এ প্রসঙ্গে মুহুরী প্রকল্প এলাকায় নিয়োজিত ফেনী পাউবোর সেকশন অফিসার (এসও) মো. নুরুল আবছার জানান, ‘আবু ইউসুপ স্বপন জায়গাটি অস্থায়ী দোকানপাট নির্মানের জন্য লীজ নিয়েছেন। পাউবোর জায়গায় স্থায়ী পাকাঘর নির্মাণের বিধান নেই।’ অপরদিকে মিরসরাইয়ের মৎস্য চাষীর ওপর হামলা ও চাঁদাবাজীর ঘটনায় জোরারগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত মামলায় এখনো স্বপনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। স্থানীয়রা জানিয়েছে গতকাল বুধবার দিনভর স্বপন মুহুরী প্রকল্প এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জোরারগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাঈন উদ্দিন জানান, স্বপন ও তার লোকজনকে ধরতে আমরা একাধিকার অভিযান চালিয়েছি। চরাঞ্চল ও নদীমাতৃক এলাকা হওয়ায় পুলিশ যাওয়ার আগেই সে এবং তার লোকজন পালিয়ে যায়।’ চাচা এমপি হওয়ায় স্বপন মিরসরাইয়ের মাছ চাষীদের থেকে চাঁদা করছে এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে গতকাল বুধবার দুপুরে এমপি রহিম উল্ল্যাহ্ বলেন, স্বপনের কাছে দুইশত একর মাছের প্রকল্প রয়েছে। সে কেন অন্যদের কাছ থেকে চাঁদা নিবে। বরং আমি এমপি হয়েছি বলে অনেকের পছন্দ হচ্ছে না, তাই আমাকে বেকায়দায় ফেলতে এমন মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।’
2014-08-29 10:42:15
source : http://mirsarainews.com/?p=55